প্রতিবন্ধী ভাতা পাবেন ঢাকা মেডিকেলের সেই শিক্ষার্থী রাজ কুমার

ঢাকা মেডিকেলের ৪০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ‘রাজ কুমার শীল’এর পরিবারের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন বিরামপুর উপজেলা সমাজ সেবা অধিদপ্তর। সরকারিভাবে ওই পরিবারের দুই ভাইকে প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

বিরামপুর উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মো. রাজুল ইসলাম সোমবার সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

এর আগে রাজ কুমার শীলের মা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিবন্ধী কার্ডে চিকিৎসকের স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. আলীর নজরে আসে বিষয়টি।

রাজকুমার শীলের বাড়ি দিনাজপুরের বিরামপুর পৌরশহরের ঘাট পাড় এলাকায়। নগিন শীল ও মা পার্বতী রাণীর ছেলে তিনি। বাবা নগিন শীল পেশায় একজন নাপিত। পরিবারের চার ভাইয়ের মধ্যে সে মেঝ। এ ছাড়াও ২ বোন রয়েছে।

এরআগে ‘ঢামেক ছাত্র রাজকুমার এখন ৫০ টাকার দিনমজুর’ ‍গণমাধ্যমে সংবাদি প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত সংবাদটি বিরামপুর উপজেলা সমাজ সেবা অধিদপ্তরের দৃষ্টিগোচর হলে তারা নিজে থেকেই তাদের কার্ড করে দেওয়ার উদ্যোগ নেন।

ডা. বেলায়েত হোসেন ঢালী’র “আমাদের বন্ধু রাজকুমার শীল” নামে একটি সংগৃহীত লেখা থেকে ঘটনার বিস্তারিত জানা যায়। এতে বলা হয়েছে, “সময়: আনুমানিক দুপুর ১ টা বেজে ৪৫ মিনিট। স্থান: বহিঃবিভাগ, বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, দিনাজপুর।

আমরা কয়েকজন মেডিকেল অফিসার ডিউটি রুমে আছি। রোগী আসা প্রায় শেষের দিকে। এমন সময় প্রায় ৭০ বছর বয়সী একজন মহিলা আসলেন। সাথে ৪৮ আর ৫২ বছর বয়সের দুজন ছেলে। কি সমস্যা জিজ্ঞেস করায় হাতের কাগজগুলো এগিয়ে দিয়ে বললেন, প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য দরখাস্ত করবেন ছেলের জন্য। অনেক কাগজের সাথে পাবনা মানসিক হাসপাতালের দু’টি ছাড়পত্র পেলাম। প্রথমে বুঝতেই পারছিলাম না, কোন ছেলে রোগী। পরে ভদ্রমহিলা বুঝিয়ে বললেন, তার দুই ছেলের জন্যই দরখাস্ত করবেন। দুইজনেরই একই অসুখ। দুইজনের মধ্যে একজনের ন্যাশনাল আইডি কার্ড এর সই দেখে কিছুটা আশ্চর্য হলাম। নাম লেখা রাজকুমার শীল। হাতের লেখাটা কেন যেন তার চেহারার সাথে মিলছে না। সুন্দর লেখা। জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কতদূর পর্যন্ত পড়াশুনা করেছেন। বললেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলাম। নিজের কান কে বিশ্বাস হচ্ছে না। একে একে উনার সব কিছু বললেন। কে-৪০ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। ঢাকা কলেজ শেষে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হয়েছিলেন। দ্বিতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষায় ফার্মাকোলজি তে ফেল করে পরে কয়েকবার পরীক্ষা দিয়েছিলেন। তারপর মানসিক অসুস্থতার (সিজোফ্রেনিয়া) জন্য বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ ছিলেন ১৪/১৫ বছর। সে সময় একটি কারখানায় কাজ করতেন।১ বছরের মত পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তিও ছিলেন। প্রাথমিক ও জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় বৃত্তিও পেয়েছিলেন, বললেন তার মা। কথা বার্তায় ও বেশ প্রকৃতস্থ মনে হল। নিয়মিত ওষুধ খেয়ে এখন আগের তুলনায় বেশ ভাল আছেন বলে জানালেন। মেডিকেলের পড়াশোনার ও কিছু বিষয় উনার এখনো মনে আছে।

বাবা পেশায় নাপিত হলেও চারজন ছেলের একজন বাদে কাউকেই সেই পেশায় আসতে দেননি। অনুমতি নিয়ে এক সময়ের এই মেধাবী মানুষটির ছবি তুললাম। কে-৪০ ব্যাচের আমার শ্রদ্ধেয় একজন স্যারের ছবি দেখিয়ে বললাম চিনতে পারেন কিনা? মাথা দোলালেন। হয়ত কিছুটা চিনতে পেরেছেন। মনে করার চেষ্টা করলেন। উনার মা ও ছেলের ক্লাসমেট এর ছবি দেখলেন। আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন।

কে জানে, সুস্থ থাকলে হয়ত এই রাজকুমার শীল হয়ে উঠতেন স্বনামধন্য ডা.রাজকুমার শীল। একজন ভাগ্যবিড়ম্বিত এবং আর্থিকভাবে অসহায় মেধাবী ছাত্রের এমন পরিণতি মেনে নেওয়ার মত নয়।’’