তরুণের চিকিৎসা দিতে আগ্রহী নয় হাসপাতাল

নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত এমন সন্দেহে এক তরুণের চিকিৎসা দিতে আগ্রহী নয় ঢাকা ও ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলো। এ অবস্থায় বিপাকে পড়েছে তার পরিবার।

বর্তমানে রাজধানীর ধানমণ্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২৭ বছর বয়সী ওই রোগী। ইতিমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে তার শরীরের রক্তসহ তিন ধরনের নমুনা পরীক্ষার জন্য নেয়া হয়েছে।
দু’এক দিনের মধ্যে তিনি ‘নিপাহ’ আক্রান্ত কিনা বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। রোগীর পরিবারকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিপাহ পজেটিভ হলে অবশ্যই তাদের হাসপাতাল ছেড়ে যেতে হবে। চলতি মৌসুমে এর আগেও দেশের উত্তরাঞ্চলে দু’জন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হন, যাদের একজন মৃত্যুবরণ করেন।

সোমবার দুপুরে ধানমণ্ডির ওই হাসপাতালে গিয়ে জানা গেছে, যেহেতু রোগটি ছোঁয়াচে, তাই তাকে হাসপাতালের এইচডিইউ ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এ কারণে সেখানকার ছয়টি শয্যা খালি রাখা হয়েছে।

বিষয়টি জানাজানি হলে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অন্য রোগীরাও আতঙ্কগ্রস্ত হবে। তাই বিশেষ নিরাপত্তায় তার চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তবে পরীক্ষার রিপোর্টে নিপাহ ধরা পড়লে তাকে সংক্রামক ব্যধি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের চিকিৎসকরা যুগান্তরকে বলেন, প্রাথমিকভাবে রোগীকে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হিসেবে ধারণা করায় এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এছাড়া সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে (আইইডিসিআর) রোগীর বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে গেছে।

সেখান থেকে রিপোর্ট এলে নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ প্রসঙ্গে সরকারের রোগতত্ত্ব রোগনিয়ন্ত্রণ গবেষণা ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে।

ইতিমধ্যে রোগী যেখানে আক্রান্ত হয়েছে সেখানে সার্ভিলেন্স টিম পাঠানো হয়েছে। তাছাড়া রোগীর রক্তসহ বিভিন্ন নমুন সংগ্রহ করে আনা হয়েছে। আগামী দু’এক দিনে পরীক্ষার ফলাফল পাওয়া যাবে।

তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বারবার সতর্ক করা হলেও মানুষকে কাঁচা খেজুর রস খাওয়া থেকে বিরত রাখা যাচ্ছে না। ফলে এবার নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পাওয়া যাচ্ছে।

সরকারের রোগ তত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআর সূত্রে জানা গেছে, ১৯ বছরের তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী বাংলাদেশে কাঁচা খেজুরের রসের মাধ্যমেই নিপাহ ভাইরাস ছড়ায়। এদেশে এ রোগ ছাড়ানোর প্রধান বাহক বাদুড়।

কেউ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তার মাধ্যমে পরিবারের সদস্য এমনকি হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্স পর্যন্ত আক্রান্ত হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিতে মৃত্যুবরণ করেন।
তিনি জানান, ১৯ বছর ধরে দেশে নিপাহ রোগটি রয়েছে। ২০০১ সাল থেকে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ৩০৫ জন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হন। আক্রান্তদের মধ্যে ২১২ জনের মৃত্যু হয়।

আক্রান্ত ও মৃতের হিসাবে ২০০১ থেকে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে মোট ৩০৫ জন। একই সময়ে আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে ২১১ জন। আক্রান্তের মধ্যে মৃত্যুর হার ৬৯ দশমিক ৬৪ ভাগ।

রোগীর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহের অধিবাসী এ রোগী সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৭তম ব্যাচের একজন শিক্ষার্থী। লেখাপড়া শেষ করে তিনি পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর পদে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে রাজশাহীর সারদায় প্রশিক্ষণরত ছিলেন।

সেখানেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর রাজশাহী মেডিকেল কলেজে নেয়া হলে সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে স্থানান্তর করতে বলা হয়। কিন্তু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে আইসিইউ নেই- এমন অজুহাতে সেখান থেকে ফিরিয়ে দেয়া হয়।

পরে রোগীর স্বজনরা রাজধানীর ধানমণ্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়। রোগীর নিপাহ হয়েছে এমন ধারণার পরে এই হাসপাতাল থেকেও রোগীকে নিয়ে যেতে বলা হয়। তবে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যস্থতায় সেখানেই তার চিকিৎসা চলছে।

রোগীর চাচা মো. শহীদুল্লাহ জানান, ১৫ ফেব্রুয়ারি আমার ভাতিজা রাজশাহীর সারদা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় প্রচণ্ড জ্বরের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ে। সে এসআই পদে উত্তীর্ণ হওয়ার পর প্রশিক্ষণ শুরু করে। সারদার পুলিশ মেডিকেল সেন্টারে দু’দিন থাকার পর অবস্থার অবনতি হলে তাকে মঙ্গলবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে সে জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকতে বকতে জ্ঞান হারায়। ২০ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার রাত এগারোটার দিকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়।

২১ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার ঢামেকে উপস্থিত হলে আইসিইউ খালি নাই এমন অজুহাতে আমার ভাতিজাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। তিনি বলেন, এরপর রাজারবাগ পুলিশ লাইন হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে আইসিইউ নেই বলে জানানো হয়। তখন রাজারবাগের উল্টো দিকে প্রশান্তি মেডিকেল হাসপাতাল নামে একটি হাসপাতালের আইসিইউতে তাকে ভর্তি করি। শুক্রবার সাড়ে ৬টার দিকে এই হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। ডাক্তাররা সন্দেহ করছে, সে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত। ২৩ ফেব্রুয়ারি রোববার আইইডিসিআর থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে গেছে।

সেখান থেকে রিপোর্ট এলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে সে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত কিনা। তিনি জানান, ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে দেখা করলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সহায়তা করেন এবং পুলিশের পক্ষ থেকে তহবিল গঠনের নির্দেশ দেন। এছাড়া সারদা থেকেও একটি তহবিল আসার কথা রয়েছে। মো. শহীদুল্লাহ অনুযোগ করে বলেন, এই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীকে রাখতে চাচ্ছে না।

তারা আমাদের চলে যেতে বলছে। অন্য কোনো হাসপাতালও রোগীকে ভর্তি নিতে চায় না। অনেক যোগাযোগ করেও কারও কোনো সাড়া পাচ্ছি না। আমার ভাতিজার সুচিকিৎসায় সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি।

বেসরকারি ওই হাসপাতালে সহকারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, চিকিৎসকরা প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করেছেন, সে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত।

তার চিকিৎসার জন্য আমাদের ছয় শয্যার এইচডিইউ ইউনিট ফাঁকা রাখা হয়েছে। সে নিপাহ আক্রান্ত হলে তার আশপাশের রোগীরা দ্রুত সংক্রমিত হতে পারে। কেন না, রোগটি ছোঁয়াচে।
তাছাড়া সরকারি নির্দেশনা রয়েছে এ ধরনের সংক্রামক রোগীদের সাধারণ হাসপাতালে রাখা যাবে না। আমরা অপেক্ষা করছি আইইডিসিআরের রিপোর্টের জন্য। রিপোর্টে নিপাহ পজেটিভ হলে অবশ্যই রোগীকে সংক্রামক ব্যধি হাসপাতালে চলে যেতে হবে।