শেখ হাসিনা ছাড়া কিছু নেই গোপালগঞ্জে

নৌকাময় গোপালগঞ্জ-৩ (কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়া)। চরম প্রতিকূল সময়েও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মভিটেতে নৌকা ছিল অপ্রতিরোধ্য। একাদশ সংসদ নির্বাচনে এ আসনে নৌকার এই ধারা আরও বর্ণাঢ্য হয়েছে। আগের নির্বাচনগুলোতে নৌকার প্রচার-প্রচারণা কম হলেও নিজেদের মেয়ে শেখ হাসিনাকে উজাড় করে দিয়েছেন এখানকার মানুষ। এবার ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ভোটারদের মধ্যে আরও বেশি উৎসাহ সৃষ্টি করেছে। 

আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা এ আসন থেকে সপ্তমবারের মতো আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়েছেন। গত ১২ ডিসেম্বর টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন তিনি। ওই দিন বিকেলে কোটালীপাড়ার শেখ লুৎফর রহমান আদর্শ সরকারি কলেজ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়াবাসীকে নিজের একান্ত আপনজন আখ্যা দিয়ে নৌকায় ভোট চান। 

টুঙ্গিপাড়ার শেখ পরিবারে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে বঙ্গবন্ধু যখন এ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নেন, তখনও নিতান্ত তরুণ তিনি। ওই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু মুসলিম লীগের প্রার্থী সেই সময়কার বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াহিদুজ্জামান ঠান্ডা মিয়াকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। নির্বাচনে জয়ী হয়ে বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী হন। এ আসনটিকে তাই মুক্তিযুদ্ধ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সূতিকাগার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৫৪ সাল থেকেই আসনটি আওয়ামী লীগের আসন এবং তখন থেকেই ভিআইপি আসন হিসেবে পরিচিত।

১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এ আসন থেকে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। সে সময় স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে টুঙ্গিপাড়া-কোটালীপাড়ার মানুষ বিপুল ভোটে শেখ হাসিনাকে নির্বাচিত করেন। তারপর ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে এলাকার মানুষ শেখ হাসিনাকে নির্বাচিত করেছেন। পশ্চাৎপদ কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়া উপজেলাকে প্রধানমন্ত্রী আধুনিক জনপদে রূপান্তর করেছেন। 

প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার শহর-বন্দর থেকে গ্রামের অলিগলি সর্বত্র এই রূপান্তরের কথাই তুলে ধরছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সর্বত্র নৌকার পোস্টার ও ব্যানারে ছেয়ে গেছে। প্রতিদিন প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে নির্বাচনী সভা থেকে উঠান বৈঠক করা হচ্ছে। নেতারা হাটবাজার এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ করছেন। প্রধানমন্ত্রীর জন্য নৌকায় চাইছেন ভোট। মিছিলে মিছিলে টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া মুখরিত। ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত গোপালগঞ্জ-৩ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা দুই লাখ ৪৬ হাজার ৬৬৮।

এই ভোটাররা ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সমাধিসৌধের প্রতি যে চরম অবহেলা করেছিল, তা মনে রেখেছেন। ওই সরকারের শাসনামলে গোপালগঞ্জ জেলার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচনী প্রচারণায় আওয়ামী লীগ গোপালগঞ্জের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণের কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে। এসব কারণে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের কর্মকাণ্ড নিয়ে এ আসনের মানুষের কোনো আগ্রহ নেই। 

শেখ হাসিনার প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার দুই উপজেলার সবকটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে নির্বাচনী জনসভার আয়োজন করা হয়েছে। ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে দিয়ে যাওয়ার আগে থেকেই আমরা ঘরে ঘরে যাচ্ছিলাম। এখন আমি প্রতিদিনই কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়া উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের দোরগোড়ায় গিয়ে বৈঠক করছি। ভোটকেন্দ্রে ভোটের দিন শতভাগ ভোটার উপস্থিত করতে তৃণমূল নেতাদের দায়িত্ব বণ্টন করে দিচ্ছি। এ ছাড়া ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার স্লিপ পৌঁছে দিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।

পক্ষান্তরে ভিআইপি এ আসনে ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থীর শিবিরে কেবলই শূন্যতা বিরাজ করছে। এখানে উৎসবের লেশমাত্র নেই। নেই প্রচার-প্রচারণার কোনো আয়োজন। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী বিএনপির সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি এস এম জিলানী। এ ছাড়া এ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রকৌশলী মো. মারুফ শেখ, স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ এনামুল হক ও উজির ফকির নির্বাচনে লড়ছেন।

এস এম জিলানী নাশকতা মামলায় কারাগারে রয়েছেন। গত ৬ নভেম্বর ঢাকা থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। বর্তমানে তিনি কাশিমপুর কারগারে আটক রয়েছেন। ১০ ডিসেম্বর নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত তার প্রচারণা চোখে পড়েনি। ২০০৮ সালে প্রথম নির্বাচনে নেমে এস এম জিলানী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হন। সে নির্বাচনে শেখ হাসিনা পান এক লাখ ৫৮ হাজার ৯৫৮ ভোট এবং জিলানী চার হাজার ৪৫১ ভোট পেয়েছিলেন। 

টুঙ্গিপাড়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন বলেন, ‘আমাদের প্রার্থী এস এম জিলানী কারাগারে থাকায় তার স্ত্রী রওশন আরাকে সঙ্গে নিয়ে চুপিসারে অল্পবিস্তর প্রচার চালাচ্ছি। প্রকাশ্যে আমাদের কোনো প্রচারণা নেই। পোস্টার, ব্যানার, সভা-সমাবেশ ও মিছিল করছি না। মাঝে একদিন প্রচার মাইক বের করেছিলাম। পরে আর করিনি। গত ২১ ডিসেম্বর থেকে প্রার্থী জিলানীর স্ত্রী নির্বাচনী এলাকায় আছেন।