জামায়াতের রাজনীতি বাঁচাতে ‘লবিস্ট গ্রুপ’ নিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রে

রাজনীতিতে টিকে থাকতে যুক্তরাষ্ট্রে ‘লবিস্ট গ্রুপ’ (তদবিরকারী প্রতিষ্ঠান) নিয়োগ করেছে জামায়াতে ইসলামী। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে সম্পৃক্তদের দলটিকে যাতে বাংলাদেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা না হয়, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্রে নীতিনির্ধারকদের কাছে তদবির করা এই লবিস্ট ফার্ম নিয়োগের অন্যতম লক্ষ্য। আদালতের আদেশে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন কমিশনে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন হারিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচনী প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তবে জামায়াতের লবিস্ট নিয়োগ নতুন কিছু নয়। এর আগেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধে সম্পৃক্ত জামায়াত নেতাদের বিচারের সমালোচনা করতে দলটি যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ওয়াশিংটনভিত্তিক লবিস্ট ফার্ম ‘হাচ ব্ল্যাকওয়েল স্ট্র্যাটেজিস এলএলসি’ সম্প্রতি নিউ ইয়র্কের স্টেটেন আইল্যান্ডের ‘অর্গানাইজেশন ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিস’ নামের একটি সংগঠনের হয়ে তদবির করার কথা বিচার বিভাগকে জানিয়েছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর জামায়াতের পক্ষে ‘হাচ ব্ল্যাকওয়েল স্ট্র্যাটেজিস এলএলসি’র সঙ্গে চুক্তি করেছেন ‘অর্গানাইজেশন ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসের’ মো. জিয়াউল ইসলাম। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে আগামী বছরের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত জামায়াতের পক্ষে তদবিরের জন্য ‘হাচ ব্ল্যাকওয়েল স্ট্র্যাটেজিস এলএলসি’ এক লাখ ৩২ হাজার মার্কিন ডলার পাবে।

চুক্তিপত্রে তদবিরের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে লেখা হয়েছে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও মানবাধিকার ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে যে নীতি অনুসরণ করছে তার পরিবর্তন না হওয়া নিশ্চিত করা।

হাচ ব্ল্যাকওয়েল স্ট্র্যাটেজিস যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগে উপস্থাপন করা নথিতে সুনির্দিষ্টভাবে জামায়াতে ইসলামীর নাম উল্লেখ রয়েছে। লবিস্ট ফার্মের করণীয় প্রসঙ্গে তিনটি অনুচ্ছেদের প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নীতি যাতে জামায়াতে ইসলামীর স্বার্থের বিরুদ্ধে না যায় তা নিশ্চিত করা। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীকে বাংলাদেশ বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত না করতে নিশ্চিত করার কথাও তাতে উল্লেখ রয়েছে।

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বাংলাদেশ সরকারের ওপর যুক্তরাষ্ট্র সরকারের চাপ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

নাগরিক সমাজের বিকাশ, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সুরক্ষা, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে উৎসাহী করা, উন্মুক্ত আলোচনায় সবার স্বাধীনভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টির কথা তাতে উল্লেখ রয়েছে। জামায়াতের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে সেখানে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর টিকে থাকার নিশ্চয়তা এবং নাগরিক সমাজে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অবাধে পূর্ণ অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে লবিস্ট ফার্মটি কাজ করবে।

তৃতীয় ও শেষ অনুচ্ছেদে আন্তর্জাতিক মান ও বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ উন্মুক্ত ও ন্যায্য বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতেও বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর তদবিরের পরও গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি সভায় জামায়াতে ইসলামীকে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে অভিহিত করে একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। প্রস্তাবটি এখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রতিনিধি সভার পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির বিবেচনাধীন আছে।

এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পলিটিকো জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ‘ব্লু স্টার স্ট্র্যাটেজিস’ নামে লবিস্ট ফার্মকে নিয়োগ দিয়েছে। এর জন্য চলতি ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত দলটিকে দুই লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার দিতে হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক, বিশ্বাসযোগ্য এবং জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে এমন একটি সংঘাতমুক্ত নির্বাচন দেখতে চায়। নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সব দলের সমান সুযোগ পাওয়ার ওপরও যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বারোপ করে আসছে।