যেনতেনভাবে ক্ষমতায় আসতে চাই না

বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের নেতারা ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ‘প্রহসনের নির্বাচনের’ মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টার অভিযোগ করলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যেনতেনভাবে ক্ষমতায় আসার কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই, জনগণ ভোট দিলেই আবার ক্ষমতায় এসে দেশের জন্য কাজ করবেন। গতকাল বুধবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এফবিসিসিআই আয়োজিত ‘ব্যবসায়ী সম্মেলন ২০১৮’-তে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সম্মেলনে দল-মত-নির্বিশেষে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা শেখ হাসিনাকে ‘আশার প্রতীক’ আখ্যায়িত করে আবারও তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন এবং আসন্ন নির্বাচনে ‘নৌকা’র পক্ষে তাঁদের সমর্থন জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘জনগণ ভোট দেবে, যাকে দেবে তারাই ক্ষমতায় আসবে। আমার এমন কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই যে, যেনতেনভাবে ক্ষমতায় আসতে হবে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে যদি ক্ষমতায় আসতে পারি, আলহামদুলিল্লাহ। যদি না পারি কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু দেশে শান্তি বজায় থাকুক, দেশের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিয়ে তার সরকার পছন্দ করে নিক। সেই পরিবেশটা বজায় থাকুক, আমি সেটাই চাই। কারণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশটা থাকলে দেশটা এগিয়ে যাবে।’

নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা থেকে বিরত থাকতে সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই নির্বাচনটা শান্তিপূর্ণ হোক। আপনাদের কাছ থেকে একটা সহযোগিতা চাই, আজকে যে সুন্দর-শান্তিপূর্ণ পরিবেশটা আছে, সব দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রেখেই যেন নির্বাচনটা হয়, সেই পরিবেশটা যেন বজায় থাকে।’

অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা ছাড়াও বিভিন্ন গ্রুপ অব কম্পানিজের মালিক, দেশি ও বহুজাতিক কম্পানির শীর্ষ ব্যবস্থাপকরা উপস্থিত ছিলেন। শেখ হাসিনা তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় দেশের বিভিন্ন খাতের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরেন।

বাস্তবায়নাধীন মেগা প্রকল্পগুলোর কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এতগুলো কাজ হাতে নিয়েছি। কোনো দিক বাকি রাখিনি। সব দিকেই উন্নয়ন করে যাচ্ছি।’ পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে ‘হাওয়া ভবন’ তৈরি করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ‘যেভাবে চাঁদা আদায় করা হয়েছিল’ তারও অবসান ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনাদের জন্য যে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করেছি, এখন তো আর বলতে পারবেন না যে, কেউ হাওয়া ভবন খুলে সব ব্যবসায়ীর কাছ থেকে থাবাথাবি করছে যে কিছু করতে গেলেই ভাগ দিতে হবে। অন্তত আমরা সেটা করি না, করব না—এটা আমাদের প্রতিজ্ঞা। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবে। সরকার হিসেবে দায়িত্ব ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ এমন একটি দল যার হাতে দেশের প্রতিটি খাতের উন্নয়নের রূপরেখা রয়েছে। ১৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলেছিলাম, ২০ হাজার মেগাওয়াট করেছি। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছি, ১৬ কোটি মানুষের দেশে ১৩ কোটি মোবাইল সিম। এগুলো ব্যবসা-বাণিজ্যকে সহজ করে দিচ্ছে।’

বাংলাদেশকে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড বানানোর স্বপ্নের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। জাতির পিতা একটা কথা বলতেন যে বাংলাদেশ হবে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড। সুইজারল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থানটা যদি দেখেন, ইউরোপের এক দিক থেকে আরেক দিক যেতে গেলে সুইজারল্যান্ডকেই ব্যবহার করতে হয়। একটা শান্তিপূর্ণ দেশ। তিনি বাংলাদেশকেও সেভাবেই গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মধ্যে একটা সেতুবন্ধ তৈরি করতে পারে বাংলাদেশ। কিন্তু তার জন্য একটা অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজন। আর সেই উন্নয়নের কাজও আমরা হাতে নিয়েছি। আর প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে একটা যোগাযোগ ও সদ্ভাব সৃষ্টি করা, সেটাও আমরা খুব সফলতার সঙ্গে করতে পেরেছি।’

রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে ঝগড়া না করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ মেটানো ও স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেই সঙ্গে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান আমরা অব্যাহত রাখব, যাতে আমাদের সমাজে শান্তি ফিরে আসে।’ তাঁর সরকারের অর্থনৈতিক নীতিমালা শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়, গ্রাম পর্যন্ত বলে উল্লেখ করেন তিনি।

চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দুর্নীতি করে নিজের ভাগ্য গড়তে আসিনি। ভাগ্য গড়তে এসেছি বাংলার জনগণের। সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নতি করাটাই আমার লক্ষ্য। অনেকেই বলে, আপনি সারা দিন-রাত এত পরিশ্রম করেন কেন? আমার বাবা এ দেশটা স্বাধীন করে দিয়েছেন। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন। সেটা তিনি করতে পারেননি। তাঁর সেই অসমাপ্ত কাজটা শেষ করা দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছি, কর্তব্য হিসেবে নিয়েছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া শিখেছে। তারা নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের জন্য কী রাখতে হবে, না হবে ওই চিন্তা কখনো করি না। আমি চিন্তা করি, বাংলাদেশের মানুষের জন্য কী রেখে গেলাম, কী করে গেলাম, ভবিষ্যতের জন্য কী করব। সবার ছেলে-মেয়েই ভবিষ্যতে সুন্দর জীবন পাক, সেটাই আমি চিন্তা করি। আর সেভাবেই আমাদের সব কর্মকাণ্ড, সব পদক্ষেপ আমরা নিয়েছি।’

ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিনিয়োগের জন্য ১০০টা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে। সেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ হবে, কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি কৃষিকাজকে আধুনিক যান্ত্রিকীকরণ করে দেব। যাতে আধুনিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা যায়, সেভাবে আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি। এগুলো বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আপনাদের কাছে সহযোগিতা চাই।’

উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে ৩০ ডিসেম্বর নৌকা মার্কায় ভোট চেয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আমাকে আরেকবার সুযোগ দিন আপনাদের সেবা করার। হাতে নেওয়া কাজগুলো যেন সম্পন্ন করতে পারি।’

এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন শেখ হাসিনার বেসরকারি খাত বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, আইসিসির সভাপতি মাহবুবুর রহমান, বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির, এমসিসিআইয়ের সভাপতি নিহাত কবীর, সাবেক সভাপতি রোকেয়া আফজাল রহমান, গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইকেল ফোলি, মাইক্রোসফট বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী সোনিয়া বশীর কবির, সিটি গ্রুপের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান, বিএসআরএম স্টিলের চেয়ারম্যান আলী হুসেন আকবর আলী, বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ, এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম, বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী চৌধুরী, ঢাকা উত্তর সিটির প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের স্ত্রী ও মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবানা হক, বেসিসের সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর, ওপেক্স গ্রুপ ও সিনহা টেক্সটাইল গ্রুপের আনিসুর রহমান সিনহা, দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন আহমেদ, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ারুল আলম চৌধুরী, হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান এ কে আজাদ, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলাম, এনভয় গ্রুপের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী কুতুব উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।