রাজনীতিতে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা – ১ দুবাই থেকে কলকাঠি নাড়ছে আইএসআই

বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারে অপতৎপরতা চালাচ্ছে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স— আইএসআই। সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে আইএসআইয়ের এক কর্মকর্তার কথোপকথনের অডিও ফাঁসের সূত্র ধরে চালানো অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিজেদের মনোভাবাপন্ন ও সমর্থক দলকে ক্ষমতায় আনতে চেষ্টা চালাচ্ছে আইএসআই। দুবাই থেকে কলকাঠি নেড়ে আসন্ন একাদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের পাঁয়তারা করছে তারা।

গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আইএসআইয়ের সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রথম সারির নেতাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। এমনকি লন্ডনে বসবাসরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে পাকিস্তানি এই গোয়েন্দা সংস্থা। এছাড়া চীনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বিএনপি-জামায়াত নেতারা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা চালানোরও প্রমাণ পাওয়া গেছে।

যোগাযোগ করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ‘আইএসআই সব সময় বাংলাদেশের রাজনীতির ওপর নগ্নভাবে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা চালায়— এটা সবার জানা কথাই। কাদের মাধ্যমে তা করা হয়— এটাও সবার জানা বিষয়। বিএনপি-জামায়াতের অনেক নেতাকর্মী তাদের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে থাকে। সম্প্রতি বিএনপির একজন শীর্ষ নেতার যে অডিও ফাঁস হয়েছে সে বিষয়ে একটি মামলা হয়েছে। আইন অনুযায়ী বিষয়টির তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিএনপি নেতা খন্দকার মোশাররফ সম্প্রতি টেলিফোনে মেহমুদ নামে যে ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন, তার পুরো নাম শহীদ মেহমুদ মুহাম্মদ শরিফ। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৫৪তম লং কোর্সে তিনি কমিশন্ডপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। পরে তিনি আইএসআইয়ে যুক্ত হন। ২০০৪ সালে অবসরে যাওয়ার পর থেকে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে বসবাস করছেন। বর্তমানে তিনি আইএসআইয়ের বেতনভুক্ত এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন। বাংলাদেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আইএসআইয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন মেহমুদ।

সম্প্রতি ফাঁস হওয়া কিছু নথিপত্রে দেখা যাচ্ছে, মেহমুদের সঙ্গে দুবাইয়ে বিএনপির সংযুক্ত আরব আমিরাত শাখার সভাপতি জাকির হোসেনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ আছে। জাকির হোসেনের মাধ্যমে লন্ডনে বসবাসরত তারেক রহমানের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ রাখেন।

খন্দকার মোশারফের অডিও কথোপকথনে শোনা যায়, বিএনপির এই নেতা বাংলাদেশে তাদের দলের কর্মকাণ্ডের জন্য আইএসআইয়ের সরাসরি সহায়তা চাইছেন। তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা এখন ভীষণ সমস্যার মধ্যে আছি। এই বিপদ থেকে আপনারাই উদ্ধার করতে পারেন।’ ওই কথোপকথনে খন্দকার মোশাররফ আগামী নির্বাচনে চীনকে ‘ম্যানেজ’ করার জন্য মেহমুদকে অনুরোধ করেন। এর জবাবে মেহমুদ আইএসআইয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করার এবং এ ব্যাপারে কাজ করার আশ্বাস দেন। খন্দকার মোশাররফ ঢাকায় আইএসআইয়ের কোনও দায়িত্বপ্রাপ্ত এজেন্টের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মেহমুদ জানান, তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন এজেন্ট বিএনপি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছি। বিষয়টি মিথ্যা, বানোয়াট ও ভুয়া। ওই (শহীদ মেহমদু) নামে আমি কাউকে চিনিও না। আমি কারো সঙ্গে কথাও বলিনি।’ বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আইএসআই প্রভাব বিস্তারের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে কারো কথা হয়নি। আমার এ বিষয়টি জানা নেই।’

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মেহমুদ ২০০৪ সালে আইএসআই থেকে অবসরে যাওয়ার পর থেকে সংস্থাটির এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। দুবাইতে তিনি আল মারজান আল কাবের জেনারেল ট্রেডিং কোম্পানির সেলস ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। আইএসআইয়ের কাছ থেকে তিনি মাসে তিন হাজার ডলার বেতন পান। বাংলাদেশি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য স্বীকৃতি হিসেবে সম্প্রতি তার বেতন বাড়িয়ে চার হাজার ডলার করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহীদ মেহমুদ আইএসআইয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তা জাভেদ মেহেদীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। তার কাজই হলো জাভেদ মেহেদীর সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের যোগসূত্র হিসেবে কাজ করা। সংযুক্ত আরব আমিরাত বিএনপির সভাপতি জাকির হোসেনের সঙ্গে মেহমুদ নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। সিলেটের জকিগঞ্জে জন্ম ও বেড়ে ওঠা জাকির হোসেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাণিজ্যে স্নাতক। বর্তমানে তিনি দুবাইয়ের রয়েল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজে কর্মরত। এবারের নির্বাচনে তিনি জকিগঞ্জ থেকে বিএনপির মনোনয়ন পেতে আগ্রহী ছিলেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জাকির হোসেন অন্তত ১১ বার শহীদ মেহমুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তাদের মধ্যে সর্বশেষ যোগাযোগ হয় গত ৭ ডিসেম্বর।

অনুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্রে দেখা গেছে, জাকির হোসেন বিএনপি ও জামায়াতের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আইএসআইয়ের গোপন যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন। লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগেরও মাধ্যম তিনি। মেহমুদের সঙ্গে কথোপকথনে তিনি তারেক রহমানকে ‘বস’ হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন। জাকির হোসেন ও শহীদ মেহমুদের একাধিক কথোপকথন থেকে জানা যায়, গত ৪ জুলাই সৌদি আরবে তারেক রহমানের সঙ্গে আইএসআইয়ের নীতিনির্ধারণী কর্মকর্তা জাভেদ মেহেদীর একটি বৈঠক হয়েছে।

খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে আইএসআই এজেন্ট মেহমুদের ফোনালাপ এবং জাকির হোসেনের সঙ্গে মেহমুদের ১১টি বৈঠক সংক্রান্ত নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, ঢাকা এবং দেশের বাইরে কয়েকটি শহরে পাকিস্তানি এই গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক এজেন্টের সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াতের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে নানামুখী তৎপরতা চালাতে আইএসআই সক্রিয় রয়েছে। এমনকি আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য আইএসআইয়ের পক্ষ থেকে একটি তালিকাও বিএনপির কাছে দেওয়া হয়েছে। তালিকাটি তারেক রহমানের কাছে পৌঁছানোর ব্যাপারটিও নিশ্চিত হওয়া গেছে।

নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দেশের রাজনীতিতে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে দেশের ভেতরে ও বাইরে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতারা এসব যোগাযোগ রক্ষা করছেন।

পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য এহসান মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে বলতে পারি, কোনও দেশের গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাব এদেশে আছে বলে আমি মনে করি না। এসব কাল্পনিক অভিযোগ। এ ধরনের কাল্পনিক কথাবার্তা কেউ কেউ করে থাকেন, তাদের এ দেশের জনগণের প্রতি আস্থা নাই।’ এসব কাল্পনিক বিষয়গুলো জনগণ বিশ্বাস করে না দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমাদের দলের রাজনীতিতে এসব কখনও ছিল না, এখনও নেই, ভবিষ্যতেও থাকবে না— এটা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি।’