কৌশলে বিএনপির চেয়ে এগিয়ে আওয়ামী লীগ

চূড়ান্ত প্রার্থী নির্বাচনে কৌশল প্রশ্নে দক্ষিণের ২১ নির্বাচনী আসনে বিএনপির তুলনায় এগিয়ে আছে আওয়ামী লীগ। আগেভাগেই প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায়ও আছে দলটি। অপরদিকে শনিবার পর্যন্ত পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি দক্ষিণের সবক’টি আসনে বিএনপির মনোনয়ন।

বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় যাদের দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়েছে তাদের কয়েকজনকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। টানা ১০ বছর বিএনপির রাজনীতি কিংবা এলাকার কারও সঙ্গে যোগাযোগ নেই এমন অনেককেও মনোনয়ন দিয়েছে দলটি। দীর্ঘ যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার পর ভোটের মাঠে এরা কতটা ভালো করবে তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে সন্দেহ, অবিশ্বাস।

মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময়সীমার ২ দিন আগেই দলীয় প্রার্থীদের হাতে মনোনয়নের চিঠি তুলে দেয় আওয়ামী লীগ। মহাজোটের অংশীদার দলগুলোর জন্যে নির্ধারিত আসনও তারা চূড়ান্ত করে আগেভাগেই। সেসব আসন শূন্য রেখে ঘোষণা করা হয় দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্তদের নাম।

অপরদিকে শনিবার বিকাল পর্যন্ত বরিশাল বিভাগের ২১ আসনের সবক’টির প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারেনি বিএনপি। বরিশাল বিভাগের ২১ আসনের মধ্যে শরিক দলগুলোকে ৪টি ছেড়েছে আওয়ামী লীগ। প্রত্যাহারের শেষ মুহূর্তে এ সংখ্যা বড়জোর আরও ১টি বাড়তে পারে।

এছাড়া ২টি আসনে একাধিক প্রার্থীকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হলেও এরই মধ্যে সেসব জায়গায় একক প্রার্থী ঘোষণা করেছে তারা। ক্ষমতাসীন দলের এ আয়োজনের বিপীরতে শনিবার পর্যন্ত সব আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারেনি বিএনপি।

পিরোজপুরের ২টি এবং ভোলার ১টি আসনে দলীয় মনোনয়ন দেয়া না হলেও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত নয় যে দক্ষিণের ২১টি আসনের মধ্যে শরিকদের ঠিক কতগুলো ছাড়বে তারা। শুক্রবার মনোনয়নের চূড়ান্ত যে তালিকা প্রকাশ করেছে বিএনপি দক্ষিণের বেশ কয়েকটি আসনের চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করেনি তারা।

এগুলো হচ্ছে- বরিশাল ৪, বরগুনা ১ ও ২ এবং পটুয়াখালী ২। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এসব আসনে বিএনপির বাইরে প্রার্থী দেয়ার সম্ভাবনা নেই। দলের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, বরিশাল-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়ন দাখিল করা একজনের জন্যে অনুরোধ জানিয়েছেন নাগরিক ঐক্যের এক নেতা।

এদিকে বিএনপি যাকে মনোনয়ন দিতে চায় তিনি ২০০৮-এর এমপি এবং বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি। বরগুনা-২ আসনে সাবেক এমপি নুরুল ইসলাম মনিকে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হলেও একই আসনে মনোনয়নের দাবিতে অনড় দলের কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব।

বরগুনা-১-এও মোটামুটি একই জটিলতা। পটুয়াখালী-২ আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মোটামুটি চূড়ান্ত সাবেক এমপি শহিদুল আলম বলেন, ‘রিটার্নিং কর্মকর্তা আমার মনোনয়ন বাতিল করেছিলেন। আপিল করে মনোনয়নের বৈধতা পেয়েছি শুক্রবার। এ কারণেই হয়তো এ আসনের চূড়ান্ত নাম ঘোষণা করেনি কেন্দ্র।’

দক্ষিণের নির্বাচনী আসনগুলোতে দলীয় মনোনয়ন দেয়া প্রশ্নে আওয়ামী লীগ যতটা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে বিএনপি ততটা দিতে পেরেছে কিনা, সেটাই এখন প্রশ্ন। এখানে এমন ৫ বিএনপি নেতাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে যারা গত ১০ বছরে একবারও আসেননি নির্বাচনী এলাকায়।

অপরদিকে আওয়ামী লীগের চমকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ৩ আসনে নতুন মুখ। আবার বিজয় নিশ্চিত হতে পারে এমন ধারণা মাথায় নিয়ে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে রাজাকার পরিবারের দু’জনকে।

মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে থাকা পিতার সন্তান এ দু’জন হলেন বরগুনা-২ আসনের বর্তমান এমপি শওকত হাচানুর রহমান রিমন এবং ঝালকাঠী-১ আসনের বর্তমান এমপি হোটেল রেইনট্রির মালিকানা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান সংসদ সদস্য বিএইচ হারুন। দলীয় মনোনয়ন প্রশ্নে বিরোধিতা কিংবা বিদ্রোহী প্রার্থী হলে দল থেকে আজীবন বহিষ্কারের ঘোষণা পর্যন্ত দিয়েছে দলটি।

এককথায় নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে সম্ভব সবকিছু করছে দলটি। তাদের মনোনয়ন নিয়ে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের ভেতরে পর্যন্ত নেই তেমন মতদ্বৈততা। এমনকি পটুয়াখালী-৩ আসনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া আওয়ামী রাজনীতির নতুন কর্মী শাহজাদা সাজুকে নিয়ে পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নেমেছেন সেখানকার নেতাকর্মীরা। নির্বাচনী লড়াই প্রশ্নে ক্ষমতাসীন দলের প্রস্তুতিটা যখন এমন ঠিক সেই সময়ে যেন অন্ধকারের পথে হাঁটছে বিএনপি।

ঝালকাঠী-২ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দলের জায়ান্ট নেতা শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। এ আসনে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে এমন একজনকে যিনি গত ১০ বছরে বলতে গেলে যাননি নির্বাচনী এলাকায়।

তাছাড়া এলাকার সব ভোটাররা তাকে ঠিকমতো চেনের কিনা তাও সন্দেহ। মনোনয়ন দেয়া হয় সাবেক এমপি ইলেন ভুট্টো ও জেবা খানকে। এরা দু’জনই বহু বছর ধরে বিচ্ছিন্ন ঝালকাঠী ২-এর রাজনীতি থেকে।

পিরোজপুর-২ আসন শরিক দলের মোস্তাফিজুর রহমান ইরান এবং পিরোজপুর-১ শরিক দলকে দিয়েছে বিএনপি। পিরোজপুর সদর আসন ছেড়ে দেয়া হয়েছে জামায়াতকে। সাঈদীর আসন বিবেচনায় দল যদি এটা করে থাকে তাহলে ঠিক হয়নি বলে মনে করছেন সেখানকার নেতাকর্মীরা। বরিশাল-১ আসনে দলের সংস্কারপন্থী নেতা জহিরুদ্দিন স্বপনকে মনোনয়ন দেয়ায় কতটা ভালো করতে পারবে বিএনপি সেটাও প্রশ্ন।

পটুয়াখালী-২ আসনে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়েছে সদ্য আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে আসা সাবেক এমপি গোলাম মাওলা রনিকে। ২০০৮-এর নির্বাচনে এমপি হওয়া রনি ছিলেন তখন আওয়ামী লীগ নেতা।

সে সময় বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-নির্যাতনের ব্যাপক অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে। ভোলা-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া সাবেক এমপি নাজিম উদ্দিন আলমকে সবার আগে পড়তে হবে যে প্রশ্নের মুখে তা হল, বিএনপি শাসনামলে ১০ বছর এমপি থাকাবস্থায় তিনি এমন কি করেছেন যে তাকে ভোট দেবে মানুষ? সেখানকার বর্তমান এমপি উপমন্ত্রী আবুদল্লা আল ইসলাম জ্যাকব ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.