প্রাথমিক খোলার নির্দেশিকা: কিছুই জানে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়

নভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী বেড়ে চলেছে আক্রান্তের সংখ্যা। এরই মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্কুল খোলার বিষয়ে নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, তারা এ বিষয়ে কিছুই জানে না। বাংলাদেশে সংক্রমণের হার বিগত সময়ের তুলনায় কমে এলেও এখনো স্কুল খোলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এই সময়ে স্কুল খোলার সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হতে পারে বলেও আশঙ্কা তাদের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্কুল খোলার সঙ্গে সম্পর্কিত যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় থাকাটা খুবই জরুরি।

গত ৮ সেপ্টেম্বর নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) পরিস্থিতির বাস্তবতায় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য নির্দেশিকা প্রকাশ করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রাথমিক বিদ্যালয় খুলে দেওয়া হলে তা কিভাবে চলবে, বিদ্যালয়গুলোতে কিভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে— এসব বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা তুলে ধরা হয়েছে নির্দেশিকায়।

অন্তত ৩৫টি বিষয় উল্লেখ করা নির্দেশিকাটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জারি করা নির্দেশনা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনেসকো, ইউনিসেফ, বিশ্ব ব্যাংক ও সিডিসি (যুক্তরাষ্ট্র) গাইডলাইন অনুসরণ করে প্রণয়ন করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

নির্দেশিকায় বলা হয়, স্কুল খুললে সব শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক পরতে এবং হাত ধোয়াসহ স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে সপ্তাহের একেক দিন একেক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ব্যবস্থা করবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও নিরাপদ এলাকা ও পরিস্থিতি বিবেচনায় এলাকাভিত্তিক বিদ্যালয় চালুর বিষয়টি বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক শৌচাগার স্থাপন বা সম্প্রসারণ, মেয়েশিশুর ঋতুকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যালয় খোলার আগে অবশ্যই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণসহ শ্রেণিকক্ষ, অফিসকক্ষ ও টয়লেটগুলো স্বাস্থ্যসম্মত ও জীবাণুমুক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। আর পাঠ পরিকল্পনায় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক— দু’জনেই বলছেন, এ ধরনের নির্দেশনা সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না।

স্বাস্থ্য সচিব মো. আবদুল মান্নান বলেন, আমাদের কাছে এমন কিছু বলা হয়নি। দেখা যাক, হয়তো নির্দেশনা চাইতেও পারে, বলতেও পারে। উনারা যদি আমাদের কোনো মতামত চায়, তখন আমরা বলব। এর আগে আসলে আমরা কিছু বলতে পারি না।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, নির্দেশিকার বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। যদি আমাদের কাছে মতামত চায়, তবে অবশ্যই তা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে সে বিষয়ে মতামত জানানো হবে।

দেশে স্কুল পুনরায় চালুর আগে প্রস্তুতি গ্রহণ করার জন্য নির্দেশিকা দেওয়া হলেও সেটি প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি— এ বিষয়টি জানতে চাই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেনের কাছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই নির্দেশিকাটি মূলত আমাদের রিওপেনিং প্ল্যান। আমরা যখন এই করোনাভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে স্কুলগুলো খুলব, তখনকার করণীয় কী— আমাদের সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে মাত্র। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই নির্দেশিকার বিষয়ে কিছু জানে না। প্রাথমিকের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের এই নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে। আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্কুল খোলার সময়ে এগুলো অনুসরণ করব। যখনই স্কুল খোলা হবে, এই নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা হবে।

এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে কি না— জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘না, তেমন না। তবে এমনিতে আমরা বলে দিয়েছি, স্কুল খোলার আগে শিক্ষকরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করবেন। তারপর বাচ্চাদের কিভাবে আমরা স্কুলে নেব, স্বাস্থ্যবিধি মেনে কিভাবে ক্লাস চালাব, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করব ইত্যাদি বিষয়ে বলা আছে। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে স্কুলে থার্মোমিটার, স্যানিটাইজার বা মাস্ক বিষয়ে সাহায্য করার জন্য। শিক্ষা বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আন্তরিক। তিনি যা দিয়েছেন, তা তো অনেক দেশই করেনি। তারপরও আমরা বাইরে থেকে দাতা সংস্থার কিছু সাহায্য নেওয়ার বিষয়ে ভাবছি। সব মিলিয়ে আমরা স্যানিটাইজার, থার্মোমিটার, মাস্ক ইত্যাদি ইত্যাদি স্কুলেই সরবরাহ করব। আমরা আমাদের সন্তানদের বিপদের মুখে ঠেলে দিতে চাই না। সে কারণেই নির্দেশনা। আর স্কুল খোলার সময় হলে তখন সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে পরামর্শ করা হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে স্কুল খোলার নির্দেশিকা দেওয়াকে বাস্তবসম্মত বললেও এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ না করাকে সমন্বয়হীনতা বলে মনে করছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তো সমন্বয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। কিন্তু তারা যদি সমন্বয়টা না করে, তাহলে কী করার আছে? স্কুল খোলা সম্পর্কিত যেকোনো বিষয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেই করতে হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সাহায্যও প্রয়োজন। কারণ স্কুল খোলার আগে উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের স্কুলেও তো সচেতনতা কর্মসূচি চালাতে হবে। একইসঙ্গে যে নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো পালনের বিষয়েও প্রয়োজন যথাযথ প্রশিক্ষণ ও স্থানীয় সরকার পর্যায়ের ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে, সমন্বিত করে সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে আসলে সবাই মিলেই বাস্তবতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের সহায়তাও নেওয়া যেতে পারে।

রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে স্কুল খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় পর্যায়ের কারিগরি পরামর্শক কমিটির সঙ্গে তো পরামর্শ অবশ্যই করতে হবে। তাদের পরামর্শ শোনা হচ্ছে কি না, সেটিও নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে।

জানতে চাইলে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য ডা. নজরুল ইসলামও জানালেন, তারাও এ নির্দেশনার বিষয়ে কিছু জানেন না। স্কুল খোলার ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসরণ করতে চান বলে জানান তিনি। বলে, সংক্রমণের মাত্রা কমে না এলে আমরা স্কুল খোলার পরামর্শ দেবো না।

ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, স্কুল খোলার বিষয়ে নির্দেশিকা কিসের ওপরে ভিত্তি করে করা হয়েছে, তা জানা নেই। কারণ আমাদের সচেতনতার মাত্রা কতুটুকু বেড়েছে, সেটা বিবেচনাধীন বিষয়। যদি স্কুল খুলতে হয় তবে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ করাতেই হবে। শুধু নির্দেশিকা দিয়ে কাজ হবে না। কারণ প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষকদের মাঝে কোভিড-১৯ বিষয়ক তথ্য কী পরিমাণ আছে— সেগুলো নিয়ে আমাদের কোনো তথ্য নেই। একইসঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নির্ণয় নিয়েও তো এখন সব কার্যক্রম স্তিমিত। কাজেই নির্দেশিকা দেওয়া হলো, কিন্তু দেখা গেল সব এলাকায় স্কুল খোলার পরিবেশ নেই— তখন কী করা হবে? এমন আরও অনেক বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। সমন্বিত উদ্যোগ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের।