টাকা ছাপিয়ে দরিদ্র মানুষের হাতে দিতে হবে: অভিজিৎ

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে স্থবির জনজীবন। তবে করোনার সাথে সাথে দিন এনে দিন খাওয়া মানুষকে লড়তে হচ্ছে ক্ষুধার সাথে। এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতি সচল রাখতে টাকা ছাপিয়ে গরিবদের হাতে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। দারিদ্র্যের কারণ ও তা দূরীকরণে বিভিন্ন নীতির কার্যকারিতা, প্রভাব নিয়ে কাজ করা ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন এই অর্থনীতিবিদ বৃহস্পতিবার একাত্তর টিভির এক অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে এ কথা বলেন।

সাংবাদিক নবনীতা চৌধুরীর সঞ্চালনায় ব্র্যাক ও একাত্তর টিভির যৌথ আয়োজনে ‘বাসায় থাকি’ অনুষ্ঠানে আলোচনায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আরও অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক আহামেদ মুশফিক মোবারক ও ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ।

অনুষ্ঠানে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ এবং অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আহমেদ মুরশিদ মোবারকও কথার বলেন।

করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে সরকারি ছুটি ঘোষিত হয়েছে। এরপর গতকাল বুধবার পঞ্চম দফায় এর মেয়াদ ৫ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।অনেক দেশের মতো বন্ধ বাংলাদেশের কারখানা, বন্ধ ব্যবসা। অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। কিন্তু পেটের ক্ষুধা তো বন্ধ নেই। উন্নত দেশের মতো অর্থনীতির চাকা বন্ধ রেখে প্রাণ বাঁচানো যাবে আমাদের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশে?

আজকের অনুষ্ঠানে মূলত এসব প্রশ্নেরই উত্তর জানতে চাওয়া হয় অভিজিৎ ব্যানার্জির কাছে।

জীবন আগে না জীবিকা আগে, অধুনা বহুল আলোচিত এ প্রশ্নের উত্তরে অভিজিৎ বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে জীবন না জীবিকা আগে, এমন প্রশ্ন উঠলে তা সাধারণ মানুষের ভয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তারা ভাবতে পারে এ অবস্থা দীর্ঘদিন চলবে। এখন প্রশ্ন হলো, এভাবে আর কতদিন। যদি এমন একটা বিষয় থাকে যে তিন মাস কষ্ট করলে এ সমস্যা থেকে বের হওয়া যাবে, তখন এই কষ্ট মানুষ মেনে নিতে পারে। কিন্তু সমস্যাটা হলো, আমরা জানি না যে, এ সমস্যা কতদিন চলবে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দেশগুলোতে যে কড়াকড়িগুলো আরোপ করা হয়েছে তার উপযোগিতা নিয়ে অধ্যাপক অভিজিতের কথা, ‘এসব দেশে আরোপিত কড়াকড়ির কী পুরোটাই ব্যর্থ হয়েছে, না আধাআধি হয়েছে। যদি আধাআধিও হয় , যদি এমন হয় যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ লাভ হয় তবে এ ধরণের কড়াকড়ির হয়তো দরকার আছে।’

লাভক্ষতির এই হিসাবের মধ্যে তো মানুষের ক্ষুধা টের পাওয়া যাচ্ছে, তাহলে অর্থনীতিতে এর প্রভাব আর কতদিন মেনে নেওয়া যায় ?

এ প্রশ্নের উত্তরে অভিজিৎ বিনায়ক খুব হতাশার কথা জানান নি। তাঁর উত্তর, ‘এর প্রভাব নিয়ে খুব বেশি কাজ হয়নি। কিন্তু যদি কোনো সামাজিক সংকট না হয় তাহলে আমরা যতদূর জানি একবার যদি অর্থনীতিকে ছেড়ে দেওয়া হরে তাড়তাড়িই তা উঠে যায়। জার্মানিতে এবং জাপানে যুদ্ধের (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ) পর, ভিয়েতনামে যুদ্ধের পর খুব তাড়াতাড়ি অর্থনীতি সচল হয়ে গিয়েছিল। খুব বেশিদিন লাগেনি। বাংলাদেশের জন্য এ তত্ত্ব কতটুকু কার্যকর তা জানিনা। কিন্তু যতটুকু মনে হয় বিষয়টি এমন নয় যে, আজ যদি অর্থনীতি বন্ধ করে দিই তবে কালও বন্ধ থাকবে।’

যেসব অর্থনীতিবিদ সরকারি তরফে প্রণোদনার জন্য এখন পর্যন্ত উচ্চকণ্ঠ তাঁদের মধ্যে বাঙালি অভিজিৎ একজন। তাঁর দেশ ভারতে ঘোষিত লক্ষাধিক রুপির প্রণোদন তাঁর কাছে যথেষ্ট মনে হয়নি।
তারপরও ঘোষিত এসব প্রণোদনায় অর্থনীতি সচলে থাকবে কী? এ প্রশ্নে নোবেল বিজয়ীর উত্তর, ‘বিষয়টি যদি এমন হয় যে এটা ছয় মাসের ব্যাপার, তবে বিদেশি সংস্থার কাছে থেকে ধার করে করতে হবে। আর যুক্তরাষ্ট্র যেটা করছে সেটা হলো তারা টাকা ছাপছে। কারণ এখন যে অর্থনীতির অবস্থা তাতে লোকেদের হাতে পয়সা নেই। আর এ অবস্থা থাকলে তারা কিছু কিনবে না। না কিনলে যাদের কাছে থেকে কিনবে , তাদের কাছেও পয়সা থাকবে না। এসব ভাবনা থেকে তারা টাকা ছাপাচ্ছে। কিন্তু এ বিষয়ে ভারত বা বাংলাদেশ দ্বিধায় আছে। এখনো তারা স্থির করতে পারেনি, কতটা টাকা ছাপানো উচিত হবে।’

অভিজিৎ বিনায়ক বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা বড় দ্বন্দ্ব তৈরি করে ফেলেছি, জীবিকা ও জীবনের মধ্যে। অতটার দরকার ছিল না। টাকা ছাপিয়ে ফেলা যেত, এবং সেভাবে জীবিকা ও জীবন—দুটোতেই সাহায্য করা যেত। এটা এখনো আমরা করছি না। আমরা হয়তো ভয়ে আছি যে এটা করলে মুদ্রস্ফীতি হবে। বা কেন করছি আমি জানি না। আমাদের আরও দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়া উচিত। টাকা ছাপিয়ে মানুষের হাতে দিই। টাকাটা আজকেই দেওয়ার বিষয় নেই। আজ খাবারের সংস্থান থাকলে আজ হয়তো বেঁচে যাব। কিন্তু পরশু কী করব। মানুষকে আশ্বস্ত করার দরকার, আপনাদের কিছু টাকা দিতে পারব। টাকাটা ব্যয় করার সুযোগ থাকলে অর্থনীতি সচল হবে।’

প্রশ্ন ছিল টাকা দেওয়া হবে, কিন্তু এই টাকা মানুষের হাতে পৌঁছানোর মতো উন্নত ব্যবস্থা কী আমাদের আছে। নিজ দেশ ভারতের উদাহরণ টেনে অভিজিৎ বলেন, নিশ্চয়ই অনেক লোকই যাদের পাওয়া উচিত তারা বাদ যাবে। কিন্তু তারপরও ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষের কাছে পৌছানো সম্ভব। সেটা হলেও তারা খরচ করবে। কিছু টাকা যদি বেহাত হয়, এর হাতে না গিয়ে ওর হাতে যায়, তাতে কী হয়েছে? এখন সেটা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নয়। এখন এগিয়ে যাওয়ার সময়।’

করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলো একেবারে শুরুতেই অবরুদ্ধ করার নীতিতে গেছে। এ নিয়ে সমালোচনাও আছে। যা উন্নত দেশ করেছে, তা আমাদের জন্য কতটুকু যুক্তিযুক্ত

এ প্রশ্নে অভিজিতের উত্তর, ‘যদি ধরে নেওয়া যায় যে এটা বেশ কিছুদিন চলবে, প্রথমে থামিয়ে দেওয়া যুক্তি যুক্ত ছিল। এখন চিন্তা করার আরেকটু সময় পাওয়া যাবে। থামিয়ে দেয়ার যুক্তি এখানে ই। আর থামিয়ে দিয়ে যে ভীষণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় আমি এর কোনো তথ্য দেখিনি। এখন কমেছে পড়ে বাড়বে না এমন কোনো যুক্তি নেই। এখন কমে গেছে পরে বেশি বেড়ে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা রয়ে গেছে। এখন কমেছে পরে হয়তো একটু বেশি বাড়বে এমন একটা সম্ভাবনা আছে। আমি অতটা চিন্তিত নই,। তিন থেকে ছয় সপ্তাহ থামিয়ে দেয়া সম্ভব। তারপর কিছু একটা করতে হবে।

অভিজিৎ বিনায়ক বলেন, এই অসুখ যেহেতু বাংলাদেশে এখনও আস্তে আস্তে ছড়াচ্ছে এতে বেশ কিছুদিন ছড়াবে। এটা নিঃসন্দেহে। একসময় আমাদের ভাবতে হবে যে এরপরে কি, এর শেষ কোথায়। এটা করতে গেলে কি কি জায়গায় প্রথমে আমরা যাব, এসব ঠিক করতে হবে। যেমন ধান কাটা। আমি ভারতের ক্ষেত্রে বলেছি, এখন যে ফটোটা আছে সেটা ফেলে রাখা যাবে না। তার জন্য কিছু একটা করতে হবে। এর জন্য কিছু ভুল করব. হয়তো ,কিন্তু সেজন্য নতুন কোনো পদ্ধতি বের করব। এটা (ফসল কাটা) আমরা কমবয়সীদের দিয়ে করাবো । তারা মুখোশ পড়ে যাবে, ফসল তুলে নেয়ার জন্য যারা আসবে তারা গ্লাভস পরে আসবে। এরকম কিছু কিছু সহজ জিনিস আমরা করতে শুরু করব। কিছু শিখব, কিছু ভুল হবে। কিছু লোকের জীবন সেজন্য বিপন্ন হবে। কিন্তু সে ভুলগুলো আমাদের করতে হবে। সেটা মানতে রাজি আছি। এখন অন্তত থামিয়ে দিয়ে একটা নতুন পরিকাঠামো তৈরি করার চেষ্টা করা যায়। খানিকটা সময় লাগবে। সে সময়টা কি আমি ঠিক মতো ব্যবহার করেছি কিনা সে প্রশ্ন থেকে যায়। দুই থেকে চার সপ্তাহ পরেই বিষয়টি উঠে যাবে তা না। ছয় মাস, নয় মাস আমাদের এই লড়াইটা লড়বো।

অর্থনীতির চাকা খুলতে যে ব্যবস্থা সেগুলো সময় সাপেক্ষ। উন্নত দেশগুলোর পক্ষে হয়তো সম্ভব। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকার কতদিন মানুষকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিতে পারবে? অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্রও লড়তে পারছে না। এখানেও রব উঠেছে ছেড়ে দাও ছেড়ে দাও। কোনো দেশই আটকাতে পারবেনা। যে সময়টা আমরা পেয়েছি সেটা সদ্ব্যবহার করতে হবে। যাদের বয়স কম তাদের কাজ দিতে হবে । কাজগুলো দরকার , যেমন ফসল কলার কাজ। হয়তো কিছু রপ্তানির কাজ। কী করে করতে হবে সেটা নিয়ে ভাবতে হবে।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে অভিজিৎ বিনায়কের পরামর্শ ছিল, ‘৫ মে পর্যন্ত বাংলাদেশের সব কিছু বন্ধ আছে। অর্থাৎ এখনো ১০ দিন সময় আছে। এসব আমরা ভাবতে পারি যে কিভাবে এগুলোকে সুষ্ঠুভাবে করা যাবে। সেখানে যতটা প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়, যারা সাপ্লাই চেইন নিয়ে চিন্তা করেন তাদের আইডিয়া নিয়ে কাজ করতে হবে। আমি বলছি না যে সব বন্ধ রাখা যাবে। কেউ পারবেনা। এর মানে এই নয় যে সময়টা সম্পূর্ণ অপচয় হয়েছে।

অভিজিৎ বলেন, ‘ভারতবর্ষে করোনা সংক্রমণের নিম্নগামী হয়েছে। যদিও সব তথ্য অবিশ্বাসযোগ্য আমি বলবো না। বাংলাদেশের তথ্য গুলো আমার হাতে নেই। কিন্তু তথ্যগুলো যদি বিশ্বাস করি কিন্তু তাদের বলতে পারি যে এটা নিম্নমুখী হয়েছে। তার মানে হল যে খানিকটা সময় পাওয়া গেছে। যে সময়টা পাওয়া গেছে সেটা ব্যবহার করি। যেখানে খুলে দেয়া যায়, সেটা খুলি। যদি ভুল হয়ে থাকে শুধরে নিই, নতুন করে শিখি। যেগুলো শিখব সেগুলো ব্যবহার করি। একটা ম্যাজিক হয়ে যাবে সেটা না ভেবে, আমাদের সমস্যাটাকে সমাধান করতে হবে এটা ভাবলে হয়তো বিষয়টি সহজ হবে।’