করোনাভাইরাস সন্দেহে ঢাকায় ৫ জন ‘আইসোলেশনে’

নভেল করোনাভাইরাস প্রতিরোধের অংশ হিসেবে কভিড-১৯ রোগের সন্দেহজনক লক্ষণ নিয়ে ঢাকায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া পাঁচজনকে ‘আইসোলেশনে’ রাখা হয়েছে। তবে তাদের সবার অবস্থাই ভালো বলে জানিয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। গতকাল মঙ্গলবার নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে সন্দেহভাজন পাঁচ রোগীকে বিচ্ছিন্ন রাখার কথা জানান আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা।

ভারত-শ্রীলঙ্কায় করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঘটলেও দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, কোনো কারণে এই ভাইরাস বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়লেও তা মোকাবেলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার।

সরকারের প্রস্তুতি তুলে ধরে মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আশপাশের দেশে যেহেতু করোনাভাইরাস এসে গেছে, বাংলাদেশেও যে আসবে না, এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে আমরা সব সময় প্রস্তুত আছি, আমাদের প্রস্তুতি আরো বৃদ্ধি করছি। করোনাভাইরাস চলে আসলেও আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নাই। আমরা আগে থেকেই সকল ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে আছি।’

এদিকে নওগাঁয় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে সিঙ্গাপুরফেরত এক বাংলাদেশি যুবক নওগাঁ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তবে তাঁর রক্তের নমুনা পরীক্ষায় করোনাভাইরাস পাওয়া যায়নি।

চীনে কভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার পর ঢাকায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল এবং সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আইসোলেশন ইউনিট চালু করে আইইডিসিআর। সেখানে সন্দেহভাজন রোগীকে আলাদা রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

ড. ফ্লোরা বলেন, ‘অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে তাদের আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। আমাদের হাসপাতালে সব সময়ই আইসোলেশন থাকে। যখনই আমরা রোগী সন্দেহ করি বা যখনই আমাদের কাছে ফোন কল আসে যে তার মধ্যে লক্ষণ-উপসর্গ আছে, আমরা বিলম্ব না করে তাকে আগে হাসপাতালে পাঠাই। নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার পর তাদের ছাড়ি।’ আইসোলেশনে থাকা পাঁচজনের সবারই শারীরিক অবস্থা এখন ভালো বলে জানান তিনি।

জরুরি প্রয়োজনে করোনাভাইরাস আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় আইসোলেশন ইউনিট চালুর নির্দেশনা দিয়েছে আইইডিসিআর।

ড. ফ্লোরা বলেন, ‘যদি সন্দেহজনক রোগী থাকে, তাদের নমুনা সংগ্রহের পর পরীক্ষা করে যেন বলতে পারি। যদি ওই রোগী পজিটিভ হয়, তাকে অন্য হাসপাতালে যেতে হয়, তাহলে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।’

নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ হলে লক্ষণগুলো হয় নিউমোনিয়ার মতো। শুরুটা হয় জ্বর দিয়ে, সঙ্গে থাকতে পারে সর্দি, শুকনো কাশি, মাথা ব্যথা, গলা ব্যথা ও শরীর ব্যথা। সপ্তাহখানেকের মধ্যে দেখা দিতে পারে শ্বাসকষ্ট।

করোনাভাইরাসের কোনো টিকা বা বিশেষায়িত ওষুধ এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। চিকিৎসকরা বলছেন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো হলে এ রোগ কিছুদিন পর এমনিতেই সেরে যেতে পারে। তবে ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদ্যন্ত্র বা ফুসফুসের পুরনো রোগীদের ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

মানুষের দেহে ভাইরাস সংক্রমণের পর লক্ষণ দেখা দিতে পারে এক থেকে ১৪ দিনের মধ্যে।

ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্যানারের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে যাত্রীদের। তাই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে, এমন দেশ থেকে কেউ এলে তাকে অন্তত ১৪ দিন ঘরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে আইইডিসিআর। সেই সঙ্গে বিমানবন্দরগুলোতে চলছে পরীক্ষা।

ড. ফ্লোরা জানান, দেশে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৯৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে কারো শরীরে নভেল করোনাভাইরাস পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষা করা হয়েছে তিনটি নমুনা।

তিনি বলেন, যাদের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে তাদের বেশির ভাগ বাংলাদেশি। এর মধ্যে চীনফেরতই বেশি, দক্ষিণ কোরিয়াফেরতও আছে। বিদেশি কয়েকজনের নমুনাও পরীক্ষা করা হয়েছে।

করোনাভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধেই জোর বেশি দিচ্ছে সরকার।

ড. ফ্লোরা বলেন, ঢাকায় আসা অতিথিদের সম্পর্কে তথ্য দিতে হোটেলগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আক্রান্ত দেশ থেকে যদি যাত্রীরা আসে, তাহলে আপনারা আমাদেরকে জানান, যাতে আমরা আমাদের সার্ভেইল্যান্স কাজ করতে পারি।

আমাদের দেশে আসা কোনো যাত্রীর মধ্যে যদি কোনো জীবাণু থাকে, তার থেকে যেন ছড়িয়ে পড়তে না পারে।’ তিনি আরো বলেন, ‘তার মানে এই নয়, যারা আসছে তারা করোনাভাইরাস আক্রান্ত। সুতরাং আমরা যেন তাদের সঙ্গে এমন কোনো আচরণ না করি, তারা যেন হেনস্তার শিকার না হয়।’

কোরিয়া, জাপান ও ইরানে কভিড-১৯ রোগটি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ায় এ তিনটি দেশ বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ—বলেছেন আইইডিসিআর পরিচালক। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ।

আমাদের অনেক শিক্ষার্থী সেখানে পড়াশোনা করে, কর্মীরা কাজ করেন। এ ছাড়া ব্যাবসায়িক সংযোগও রয়েছে। এ কারণে যেসব দেশ থেকে যাত্রীরা আসলে আমরা অতিরিক্ত ব্যবস্থা নিচ্ছি সেই তালিকার মধ্যে তাদেরকে রেখেছি।’

‘মুজিববর্ষের অনুষ্ঠান বন্ধ হবে না’ : করোনাভাইরাস নিয়ে সরকারের প্রস্তুতি জানাতে গতকাল সংবাদ সম্মেলন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেলে তাদের কিভাবে চিকিৎসা দেওয়া হবে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুসরণ করে এরই মধ্যে ট্রিটমেন্ট প্রটোকল তৈরি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বুকলেট তৈরি করেছি। ডাব্লিউএইচওর গাইডলাইন অনুসরণ করে চিকিৎসাপদ্ধতি (ট্রিটমেন্ট প্রটোকল) তৈরি করা হয়েছে। ঢাকার কুয়েত মৈত্রী হাসাপতালে বিশেষ ব্যবস্থা করেছি। বক্ষব্যাধি হাসপাতালকেও বিশেষভাবে তৈরি করা হচ্ছে, সেখানে ২০ শয্যার একটি আইসিইউয়ের ব্যবস্থা করছি। ক্রিটিক্যাল রোগী যদি পাওয়া যায়, সেখানে আমরা সেবা দেব।’

জেলা পর্যায়ের প্রতিটি হাসপাতালে যেন আইসিইউয়ের ব্যবস্থা থাকে, সেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি জেলায় আইসোলেশন ওয়ার্ড করেছি। বিশেষ করে হাসপাতালের টপ ফ্লোরে এই ওয়ার্ড করেছি।

আল্লাহ না করুন যদি কখনো দেখা যায়, রোগী বাড়ে, তাহলে হাসপাতালের বাইরেও কিছু প্রতিষ্ঠান এখন থেকেই মার্ক করে রাখছি, যেখানে রোগীদের রাখা যাবে। বিশেষ করে স্কুল, কলেজ, মিলনায়তন, কমিউনিটি সেন্টারে রাখার ব্যবস্থাও করছি। স্থানীয় পর্যায়ের কমিটি এসব ঠিক করে রাখবে।’

জাহিদ মালেক জানান, হাসপাতালে যেসব চিকিৎসক, নার্স কাজ করবেন, তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। গাউন, মাস্ক, গ্লাভস যথেষ্ট পরিমাণে দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ভিডিও কনফারেন্স করে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, সব জেলায় জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে সব উপজেলায় আরেকটি করে কমিটি করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এসব কমিটির পাশাপাশি আমার (স্বাস্থ্যমন্ত্রী) সভাপতিত্বে ও মন্ত্রিপরিষদসচিব, মুখ্য সচিব অন্যান্য সিনিয়র সচিবসহ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, এডিবি, ইউনিসেফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ইউএসএআইডির প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ৩১ সদস্যবিশিষ্ট একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এককথায় সব দিক দিয়েই করোনাভাইরাস প্রতিরোধে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। সুতরাং দেশে কোনো কারণে করোনাভাইরাস চলে এলেও তা বড় কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।’

জাহিদ মালেক বলেন, ‘যেহেতু দেশে এখন পর্যন্ত একজনও করোনাভাইরাস রোগী পাওয়া যায়নি, কাজেই করোনাভাইরাসের কারণে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর কোনো অনুষ্ঠান বন্ধ থাকবে না।’

বিশেষ প্রয়োজনে বিদেশ থেকে দেশে আসতে এবং বিদেশে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘যে দেশ থেকেই আসুন না কেন সেলফ কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন।’
দিল্লিতে কোয়ারেন্টাইনে থাকা বাংলাদেশিদের করোনাভাইরাসের লক্ষণ দেখা যায়নি : কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে আমাদের কূটনৈতিক প্রতিবেদক জানান, গত সপ্তাহে চীনের উহান থেকে ভারতীয় বিমানে করে নয়াদিল্লিতে পৌঁছানো ২৩ বাংলাদেশির মধ্যে এখনো কারো করোনাভাইরাসের লক্ষণ পাওয়া যায়নি। গত বৃহস্পতিবার থেকে তাঁরা দিল্লিতে কোয়ারেন্টাইনে আছেন।

এদিকে ইতালির বেসামরিক সুরক্ষা কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে মিলানে এক বাংলাদেশির করোনাভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার খবর দিয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যম।