কমছে করোনা আতঙ্ক, চীনের বন্দরগুলোতে পণ্য জাহাজীকরণ শুরু

নভেল করোনাভাইরাসের আতঙ্ক কাটিয়ে ওঠার পর চীনের অনেকগুলো সমুদ্রবন্দর থেকে পণ্য জাহাজীকরণ শুরু হয়েছে। চীনা নববর্ষ এবং করোনাভাইরাস ধরা পড়ার পর এসব বন্দরে কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ ছিল।

এতে বিপুল পণ্য চীনের এসব বন্দর ইয়ার্ড এবং চীনা কারখানার গুদামে আটকে ছিল। পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসায় এসব এলাকার কারখানায় উৎপাদন শুরু হয়েছে। ফলে এসব এলাকার পাশে থাকা সমুদ্রবন্দরগুলো গত ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ধাপে ধাপে সচল হয়েছে।

এর ফলে তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল, অন্যশিল্পের পণ্য এবং ভোগ্যপণ্য কন্টেইনারভর্তি হয়ে জাহাজে তোলা হয়েছে। এসব পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর পৌঁছতে অন্তত ১২ দিন সময় লাগবে।

চীনের এসব বন্দরে কার্যক্রম শুরু হওয়ায় হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন চরম উদ্বেগে থাকা চীনা পণ্যের দেশীয় আমদানিকারকরা। আটকে থাকা পণ্য জাহাজীকরনের খবরে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যবসায়ীদের মাঝে।

জানতে চাইলে গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ প্রথম সহ সভাপতি এম এ সালাম বলেন, ‘চীনের বন্দরগুলোতে পণ্য জাহাজীকরণ শুরু হওয়ায় আমরা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। এতে দেশের পোশাক শিল্পের উদ্বেগ কিছুটা হলেও কেটেছে।

করোনাভাইরাসের কারণে চীনে ছুটি আরো দীর্ঘায়িত হলে আমরা চরম অনিশ্চয়তায় পড়ে যেতাম। এখন আমাদের কাঙ্ক্ষিত পণ্য চীনের কারখানা থেকে কি পরিমাণ সরবরাহ দিতে পারছে সেটার অপেক্ষায় আছি।’

ভাইরাসের কারণে আমরা একমাসের ধকল সামাল দিতে পেরেছি বন্ধের আগে থেকেই বাড়তি পণ্য আমদানি করায়। এখন চীনের কারখানাগুলো যদি পুরোদমে উৎপাদন শুরু করে তাহলে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে। আর আমাদের উৎপাদনও অব্যাহত রাখতে পারবো। আমার নিজের কারখানার পণ্যও গতকাল চীনের বন্দরে জাহাজীকরণ হয়েছে।

চীন-চট্টগ্রাম বন্দর সরাসরি কন্টেইনার জাহাজ সার্ভিস চালু আছে বিশ্বের শীর্ষ শিপিং লাইন মায়ের্কস লাইন এরর। চীনের সাংহাই এবং নিমবো বন্দর থেকে তাদের কন্টেইনার পরিবহন সেবা রয়েছে।

করোনাভাইরাস ধরা পড়ার পর চীনের সাংহাই বন্দর থেকে ১৫ শ একক কন্টেইনার নিয়ে ‘এমসিসি ইয়াংগুন’ জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছেছে ২২ ফেব্রুয়ারি। কোয়ারেনটাইন তদারকিতে থাকার পর চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে ভিড়েছে জাহাজটি।

জানতে চাইলে মায়ের্কস লাইন এর শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, করোনাভাইরাস অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসার পর চীনের সমুদ্রবন্দরগুলোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

সাংহাই ও নিমবো এই দুটি বন্দর থেকে প্রধানত বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের কাপড় জাহাজীকরণ হয়। সেই বন্দর থেকে আমাদের পণ্যভর্তি জাহাজ আসতে শুরু করেছে। এটা অবশ্যই স্বস্তির বিষয়।

তিনি বলেন, এখন চীন থেকে সরাসরি চট্টগ্রামে দুটি কন্টেইনার জাহাজে পণ্য পরিবহন হয়। পণ্যের বুকিং বাড়লে জাহাজও বাড়িয়ে দিবো। আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। এসব জাহাজে কী পরিমাণ পণ্য আছে তা জানা যাবে জাহাজ বন্দর ত্যাগের পর।

চীনের প্রায় সবগুলো বন্দর থেকেই পণ্য জাহাজীকরণ শুরু হয়েছে। এরমধ্যে চট্টগ্রামমুখী পণ্যভর্তি কন্টেইনারও আছে। জানতে চাইলে মেডিটারিনান শিপিং কম্পানির মহাব্যবস্থাপক আজমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, চীনের ৯০ শতাংশ কারখানা এখন উৎপাদন শুরু করেছে। কিংডাও বন্দর ছাড়া বাকি বন্দরগুলো সচল হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আমরা কাঙ্ক্ষিত মাত্রার পণ্য বুকিং পাইনি।

চীনের বন্দর থেকে পণ্য জাহাজীকরণ শুরুর কথা নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম ইপিজেডের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কারখানা অ্যাপারেল জেবি ২১ লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক এ কে এম মহিউদ্দিন বলেন, ৪ মার্চ থেকে আমাদের পণ্য জাহাজীকরণ হবে।

একইসাথে উড়োজাহাজেও আসছে কারখানার কাঁচামাল। এরপরও ধারাবাহিকভাবে পণ্য জাহাজীকরণ হবে। সেই পণ্য নির্দিষ্ট সময়ে দেশে পৌঁছানোর ওপর নির্ভর করছে আমাদের কারখানা সচল থাকা।

দেশীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, চীন থেকে জাহাজগুলো পণ্য নিয়ে দ্রুত চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছবে। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর থেকে যাতে অতিদ্রুত পণ্য ছাড় করে কারখানায় নেয়া যায় সেই পদক্ষেপ চান তৈরি পোশাক শিল্প উদ্যোক্তারা।

চট্টগ্রাম ইপিজেডের কোরিয়া-ভিত্তিক কারখানা হেমপেল রী ম্যানুফাকচারিং কম্পানির মহাব্যবস্থাপক বিশ্বজিত বিশ্বাস বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমরা চীনা নববর্ষের বন্ধের আগে বাড়তি পণ্য এনে গুদামে রেখেছি।

এরপরও কারখানা সচল রাখতে বাড়তি খরচ দিয়ে উড়োজাহাজেও পণ্য আনতে হচ্ছে। এতে বিদেশি ক্রেতাও আমাদের সহায়তা করেছেন। চীন থেকে নতুন পণ্য জাহাজীকরণ শুরু হবে মার্চের প্রথম সপ্তাহে। কিন্তু শেষপর্যন্ত উৎপাদন সচল রাখা না গেলে এক সপ্তাহ কারখানা ছুটি দিতে হবে। কারণ চাহিদা অনুযায়ী পণ্য না থাকলে তো কারখানা সচল রাখা যাবে না।

এদিকে, তৈরি পোশাকশিল্পের পণ্য ছাড়াও আদা-রসুন এবং ফলের চালান কন্টেইনারে করে আসা শুরু হয়েছে। এসব পণ্যের বেশিরভাগই আসে চীনের কুইংডাও পোর্ট থেকে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি এই বন্দর থেকে আদা, রসুন ও ফলভর্তি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কন্টেইনার জাহাজীকরণ শুরু হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে চীন থেকে আদা-রসুন আমদানিকারক রেজাউল করিম আজাদ বলেন, বন্দরে আটকে থাকা বিপুল পণ্য জাহাজে উঠেছে। এগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছতে ১৪ দিন লাগবে। আর দেশে পাইকারি বাজারে এসব পণ্যের দাম ক্রমাগত কমতে থাকায় আমরা নতুন করে চীন থেকে পণ্য আনছি না।