দিল্লি সহিংসতা: ৬ মুসলিমকে বাঁচিয়ে জীবন সঙ্কটে প্রেমকান্ত

সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) বিরোধিতায় দিল্লিতে শুরু হওয়া আন্দোলন কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের হামলায় সহিংসতায় রূপ নেয়। আর সেই সহিংসতায় এ পর্যন্ত ৩৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন দুই শতাধিক। ফলে রাজধানীর একাংশে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে একে অপরের প্রতি বিরাজ করছে ঘোর অবিশ্বাস।

একইসঙ্গে সৃষ্টি হয়েছে এমন কিছু গল্পের যা প্রমাণ করে মানবতা এখনো টিকে আছে পৃথিবীতে। এমনই এক গল্পের স্রষ্টা প্রেমকান্ত বাঘেল। ইন্ডিয়া টাইমসসহ ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোতে উঠে এসেছে, কীভাবে নিজের জীবন বাজি রেখে ৬ জন মুসলিম প্রতিবেশীর জীবন বাঁচিয়েছেন প্রেমকান্ত। ঘটনার দিন দাঙ্গা চলাকালীন প্রেমকান্তের বাড়ির পাশে থাকা মুসলিম বাড়িগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেয় হিন্দুত্ববাদীরা।

প্রেমকান্ত যখন দেখলেন তার মুসলিম প্রতিবেশীদের বাড়িতে আগুন জ্বলছে তিনি এক মুহূর্ত দেরি না করে তাদেরকে সাহায্য করতে চলে যান। জীবন বাজি রেখে প্রতিবেশীদের উদ্ধার করতে থাকেন। আগুন জ্বলতে থাকা ঘরগুলো থেকে বের করে আনেন আটকে পড়া মানুষদের। তবে মুসলিম বন্ধুর বয়স্ক মাকে উদ্ধার করতে গিয়ে গুরুতর দগ্ধ হয়েছেন প্রেমকান্ত। দগ্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রাণ বাঁচিয়েছেন অন্তত ৬ জন মুসলিমের। তবে দগ্ধ হওয়ার পরেও তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়নি কেউ। সারারাত একইস্থানে থাকার পর পরদিন তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন তার অবস্থা গুরুতর। শরীরের ৭০ শতাংশেরও বেশি পুড়ে গেছে। তাকে বাঁচানোর চেষ্টা চলছে। তবে তার অবস্থা এখনো সংকটাপন্ন। প্রেমকান্ত সর্বশেষ জানিয়েছেন, তিনি তার বন্ধু ও তার প্রতিবেশীদের রক্ষা করতে পেরেছেন ভেবে তৃপ্তি অনুভব করছেন।

প্রেমকান্তের মতো এমন অনেকেই এগিয়ে এসেছেন দিল্লির দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্তদের বাঁচাতে। মুসলিমদের পাশে দাঁড়িয়েছে দিল্লির শিখ সমপ্রদায়ও। হামলা থেকে নিরাপদ থাকতে যেসব মুসলিম ঘর ছেড়েছিলেন তাদের জন্য নিজেদের একটি প্রার্থনাস্থল গুরুদুয়ারার দরজা খুলে দিয়েছেন দিল্লির শিখরা। মুসলিমদের পাশে দাঁড়িয়েছেন ভারতের রাজধানীর অশোকনগরের হিন্দুরাও। তারা ক্ষতিগ্রস্ত অনেক মুসলিম পরিবারকে নিজেদের বাড়িতে সুরক্ষা দিয়ে রেখেছেন। দাঙ্গাকারীদের থামাতে নিজেরা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। ভ্রাতৃত্বের নজির রেখেছেন মুসলিমরাও। বুধবার হিন্দুদের মন্দিরে হামলা হলে স্থানীয় অন্য মুসলিমরা হাতে হাত রেখে মানবশৃঙ্খল গড়ে তোলে। দাঙ্গাকারীদের হাত থেকে রক্ষা করে চাঁদবাগের একটি মন্দিরকে।

উল্লেখ্য, গত রোববার থেকে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। দ্রুতই এটি সামপ্রদায়িক দাঙ্গায় পরিণত হয়। এখন পর্যন্ত মোট ৩৪ জন নিহত হয়েছেন এই দাঙ্গায়। এরমধ্যে শুধু বৃহসপতিবার নিহত হয়েছেন ৭ জন।

কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা মুসলমানদের দোকানপাট, বাড়িঘর, মসজিদ মাদরাসায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এ অবস্থায় অসহায় মুসলিমদের পাশে দাঁড়ায় প্রতিবেশী হিন্দুরাও। এমনই এক সমব্যথী যুবক প্রেমকান্ত। প্রতিবেশী মুসলিমদের ওপর বর্বর অত্যাচার সইতে না পেরে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আগুন ৬ জন মুসলমানের জীবন বাঁচিয়ে তিনি এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।

ভারতের সংবাদ মাধ্যম জানাচ্ছে, প্রতিবেশী ৬ মুসলিমকে আগুন থেকে রক্ষা করতে গিয়ে ভয়াবহ পুড়ে গেছেন দিল্লির বাসিন্দা প্রেমকান্ত বাঘেল। তার শরীরের ৭০ শতাংশ পুড়ে গেছে। বর্তমানে দিল্লির জিটিবি হাসপাতালে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উত্তর-পূ্র্ব দিল্লির বিভিন্ন জায়গায় হিংসা ছড়ালেও শিব বিহার এলাকাতে শান্তি বজায় ছিল। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে আচমকা ওই এলাকার কিছু মুসলিম বাসিন্দার বাড়িতে পেট্রোল বোমা মারতে শুরু করে কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা। এর ফলে বেশ কয়েকজনের বাড়িতে আগুন লেগে যায়। এ খবর শোনার পরেই তাদের বাঁচাতে ছুটে যান প্রেমকান্ত বাঘেল। ঘটনাস্থলে পৌঁছে যানতে পারেন তার এক বন্ধুর বৃদ্ধা মা ও আরও কয়েকজন মানুষ বাড়িতে আটকা পড়েছেন। সেখানে ভয়াবহ আগুন লেগে যাওয়ায় কেউ তাদের উদ্ধার করতে যাচ্ছিল না। কিন্তু স্থির থাকতে পারেননি প্রেমকান্ত। আশপাশের সবাই নিষেধ বারণ করলেও জ্বলন্ত বাড়ির মধ্যে ঢুকে বন্ধুর বৃদ্ধা মাসহ মোট ৬ জনকে বাইরে বের করে আনেন। ততক্ষণে শরীরের ৭০ শতাংশ পুড়ে যায় প্রেমকান্তর।

তাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য প্রতিবেশী আর কেউ এগিয়ে আসেনি। আর বেঁচে যাওয়া মুসলিম প্রতিবেশীরাও ছিলেন আহত এবং তাদের লুকিয়ে থাকতে হয়েছে। পরদিন সকালে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।